মসজিদের ভিতর লাশ আর লাশ। লাশের স্তুপ। দেখে মনে হচ্ছে, কোরবানির গরুর চামড়া ছাড়ার পর যে-ভাবে মৃত পশুটিকে মাটিতে ফেলে রাখা হয়, ঠিক তেমনই। নামাজ আদায় করতে গিয়ে ৪৯জন নিরীহ মানুষ প্রতিশোধের বলি হয়েছেন। এক শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বর্বরতার সকল সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীকে আরেক বিষাক্ত ও ভয়ানক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। অস্ত্রের সামনে আল্লাহ্‌, ভগবান, ঈশ্বরও ক্ষুদ্র হয়ে পড়েছে। অস্ত্রের সামনে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডাসহ সকল প্রার্থনালয়ই খুবই ক্ষুদ্র আজ।

আল্লাহ্‌ কাউকে মারে না। তেমনই আল্লাহ্‌ কাউকে বাঁচিয়ে রাখে না। বরং মানুষ মানুষকে মারে। মানুষই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। এতো মানুষকে হত্যা করে কি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা জয়ী হয়েছে? না, বরং পরাজিত হয়েছে। যখনই মানুষ মানুষকে ধর্ম, জাতীয়তাবাদের কারণে হত্যা করে, তখনই সেই মতাদর্শ পরাজিত হয়। তখনই সেই মতাদর্শ বাতিলের দাবি রাখে। কিন্তু, মানুষ পরিবর্তনের পরিবর্তে প্রতিশোধকেই বেছে নেয়।

যতো দিন এই দুনিয়াতে কুৎসিত মতাদর্শের হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্যকে আগ্রাধিকার দেওয়া হবে, ততোদিন রক্ত ঝরবেই। যখন মুসলমানেরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদী, নাস্তিকদের হত্যা করে, তখন মুসলমানেরাই চিৎকার করে বলতে থাকে- ধর্মের সাথে এর কোন যোগসূত্র নেই। অথচ ধর্মের বইগুলোতে, মসজিদে, মাদ্রাসা, ওয়াজ মাহফিলগুলোতে প্রতিনিয়ত বিধর্মীদের প্রতি কী মনোভাব ব্যক্ত করা হয় তা কারো অজানা নয়। এই যে মানুষের প্রতি মানুষের এতো ক্ষোভ, রাগ, বিদ্বেষ, হিংসা- তা কি ভালোবাসা দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না?

ইহুদী মরুক, নাস্তিক মরুক, খ্রিষ্টান মরুক, হিন্দু মরুক, বৌদ্ধ মরুক আর মুসলমানই মরুক না কেনো; সকলেই তো মানুষ, সকলের রক্তই তো লাল। সকলেই তো ব্যাথা অনুভব করে। তাহলে এতো বিদ্বেষ পুষে লাভটা কী?

সংক্ষিপ্ত আকারে দুটি ছোট্ট বাস্তব ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

২০০৪ সালে যে দিন প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর আক্রমণ করা হয় এবং যে দিন খবর পাওয়া যায় যে হুমায়ুন আজাদ আর বেঁচে নেই- তার পরের দিন বাঙলাদেশের অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসাতে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। আনন্দ মিছিল করা হয়েছিলো। ওইদিন ইসলামের নাকি জয় হয়েছিলো! মানুষ হত্যা করে কীভাবে ধর্ম জয়যুক্ত হয় তা আদৌ বুঝলাম না।

২০০৪ সালে যখন হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর সংবাদ জানা গিয়েছিলো- সেদিন থেকে অনেক মানুষ আমাকে খুনি বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। তখন আমি অনেক ছোট্ট, মাত্র ১৩, আমার রক্ত অনেক গরম। তারা চেয়েছিল আমি যেন অস্ত্র তুলি, অস্ত্র তুললে এতদিনে রাজনীতিবিদ হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু, আমরা প্রতিশোধে বিশ্বাসী নই। ভালোবাসা দিয়েই আমরা সকলকে গ্রহণ করতে চাই।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *